মানবাধিকার

লিণ্ডসে গ্রাহাম ইসরায়েলের অন্ধ সমর্থক, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও যুদ্ধবাজ এক সেনেটর

যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ রিপাবলিকান সেনেটর লিণ্ডসে গ্রাহামের আকস্মিক প্রয়াণের পর বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে তার দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক জীবন। ৭১ বছর বয়সে সংক্ষিপ্ত ও আকস্মিক অসুস্থতার পর মারা যাওয়া দক্ষিণ ক্যারোলিনার এই নেতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মূলত দুটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল—একদিকে ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত ও অন্ধ সমর্থন এবং অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা।

42 বার পঠিত
লিণ্ডসে গ্রাহাম ইসরায়েলের অন্ধ সমর্থক, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও যুদ্ধবাজ এক সেনেটর
যুদ্ধ ও সামরিক আগ্রাসনের একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক:
দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে লিণ্ডসে গ্রাহাম ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রভাবশালী ও কট্টর যুদ্ধপন্থী (Hawkish) রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ থেকে শুরু করে লিবিয়া ও আফগানিস্তান—সবক্ষেত্রেই তিনি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছেন। সাম্প্রতিক সময়েও রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছিলেন তিনি।

ইসরায়েলের জন্য অন্ধ ও শর্তহীন লবিং:
৯/১১ পরবর্তী সময়ে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়ার যে ধারা তৈরি হয়েছিল, গ্রাহাম ছিলেন তার মূল হোতাদের একজন। ২০২১ সালে গাজায় ইসরায়েলি হামলার পর তিনি স্বশরীরে ইসরায়েল সফর করেন এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়িয়ে 'মোর ফর ইসরায়েল' (ইসরায়েলের জন্য আরও বেশি কিছু) সম্বলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। পরবর্তীতে তিনি ইসরায়েলের জন্য অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন সামরিক সহায়তাও নিশ্চিত করেছিলেন।

ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিদ্বেষ ও অমানবিক মন্তব্য:
গাজায় চলা আগ্রাসনের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের অধিকারকে তোয়াক্কা না করে গ্রাহাম একাধিকবার বিতর্কিত বক্তব্য দিয়েছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি ফিলিস্তিনিদের তুলনা করেছেন 'নাৎসিদের' সঙ্গে এবং হিরোশিমা-নাগাসাকির মতো গাজায় পারমাণবিক বোমা ফেলার পরামর্শ দিয়ে উগ্র ও বর্ণবাদী চরমপন্থার জন্ম দিয়েছিলেন।

ইরানের সাথে যুদ্ধ বাঁধানোর জোর প্রচেষ্টা:
নেতানিয়াহুর সুরেই গ্রাহাম ইরানের কট্টর বিরোধী ছিলেন। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে দেখা করে তেহরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে তিনি ট্রাম্পকে দিয়ে 'মেক ইরান গ্রেট এগেইন' লেখা একটি টুপিতে স্বাক্ষর করিয়েছিলেন। পরবর্তীতে মার্কিন-ইরান সামরিক সংঘাত শুরু হলে তিনি ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী ভূমিকার সবচেয়ে কড়া সমর্থক হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করেন।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রূপান্তর:
একসময় ট্রাম্পের তীব্র সমালোচক হলেও, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর গ্রাহাম মার্কিন ক্যাপিটল হিলে তার সবচেয়ে অনুগত ও বিশ্বস্ত মিত্রদের একজন হয়ে ওঠেন। গ্রাহাম নিয়মিত ট্রাম্পের সাথে বৈঠক ও গলফ খেলতেন এবং ট্রাম্পের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকতেন।

প্রয়াত রিপাবলিকান সেনেটর জন ম্যাককেইনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন লিণ্ডসে গ্রাহাম। ২০১৮ সালে ম্যাককেইন মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত গ্রাহাম ও ম্যাককেইন যৌথভাবে ট্রাম্পের কট্টর নীতির সমালোচনা করে আসছিলেন। কিন্তু ম্যাককেইনের মৃত্যুর পর গ্রাহামের আকস্মিক এই ট্রাম্পপন্থী রূপান্তর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিস্মিত করে। ডেমোক্র্যাট ও অনেক কট্টরপন্থী রিপাবলিকানরা তার এই নীতি পরিবর্তনকে ক্ষমতা ও ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকার সুবিধাবাদী রাজনীতি হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

লিণ্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাকে 'ইসরায়েলের সর্বকালের সেরা বন্ধু' বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রাহামকে একজন 'প্রকৃত দেশপ্রেমিক' হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং দক্ষিণ ক্যারোলিনার গভর্নরকে পরামর্শ দিয়েছেন যেন তার শূন্য আসনে গ্রাহামের বোন ডারলিন গ্রাহাম নরডোনকে নিযুক্ত করা হয়। গ্রাহামের চিরবিদায়ের মধ্য দিয়ে মার্কিন ক্ষমতার অলিন্দে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে অবিরাম যুদ্ধকে বৈধতা দানকারী ও উগ্রপন্থী নীতি নির্ধারণের একটি প্রধান কণ্ঠের চিরসমাপ্তি ঘটল।