ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে, যারা তাঁদের অসামান্য বীরত্ব, রণনৈপুণ্য এবং নেতৃত্বগুণ দিয়ে মানব সভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছেন। তেমনই একজন বিস্ময়কর চরিত্র হলেন ৭ম শতাব্দীর আরব যোদ্ধা খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রাদিয়াল্লাহুআনহু)। বক্তৃতায় তাঁকে সর্বকালের সেরা তিন যোদ্ধার একজন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যা হয়তো বিতর্কের জন্ম দিতে পারে, কিন্তু তাঁর সামরিক অর্জনগুলোর দিকে তাকালে এই দাবিকে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। এই প্রবন্ধটি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের (রা.) জীবন, সামরিক অভিযান এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরবে, যা প্রায়শই পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাস চর্চায় উপেক্ষিত থাকে।
ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন এবং একটি উপেক্ষিত অধ্যায়
পশ্চিমা বিশ্বের ইতিহাস শিক্ষাদান পদ্ধতি প্রায়শই একটি “সান্নিধ্য পক্ষপাত” এবং “বর্ণবাদী পক্ষপাত”-এ আক্রান্ত, যেখানে ইউরোপ-কেন্দ্রিক বর্ণনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের অসামান্য অবদানকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। বক্তৃতায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কিভাবে মেসোপটেমিয়া ও মিশরকে পশ্চিমা সভ্যতার জন্মভূমি হিসেবে স্বীকার করেও, পরবর্তীতে এর বিকাশকে কেবল ইউরোপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ দেখানো হয়, যেন এই সভ্যতা মধ্যপ্রাচ্য থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। মধ্যযুগে (তথাকথিত ‘অন্ধকার যুগ’ হিসেবে ইউরোপে পরিচিত) যখন ইউরোপে অনাধুনিক জীবনযাপন, অপরিসর রাস্তাঘাট এবং নিম্ন জীবনযাত্রার মান বিদ্যমান ছিল, তখন মধ্যপ্রাচ্যে অত্যাধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, রাতের আলোকিত রাস্তা এবং উন্নত শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদে (রা.) এর গল্প এই উপেক্ষিত ইতিহাসেরই এক উজ্জ্বল অংশ।
প্রাচীন সাম্রাজ্যগুলোর দুর্বলতা: রোমান ও পারস্য সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস
খালিদের (রাদিয়াল্লাহুআনহু) উত্থানের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের দীর্ঘদিনের শত্রুতা এবং তাদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা সম্পর্কে জানতে হবে। ৫৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ক্রাসাসের নেতৃত্বে রোমানরা পারস্য আক্রমণ করলে ‘কাররাহের যুদ্ধ’ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে পারস্যের হালকা অশ্বারোহী তীরন্দাজ এবং বর্ম পরিহিত ক্যাটাফ্র্যাক্ট (সাঁজোয়া অশ্বারোহী) বাহিনীর কাছে রোমানরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়, ক্রাসাস নিহত হন এবং গলিত সোনা দিয়ে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এই যুদ্ধ প্রায় ৭০০ বছরের রোমান-পারস্য সংঘাতের সূত্রপাত ঘটায়।
এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ উভয় সাম্রাজ্যকে অর্থনৈতিক ও জনবল সংকটে ফেলে দেয়। এর উপর যোগ হয় পরিবেশগত ও মহামারীর প্রভাব: ইন্দোনেশিয়ান জেলেদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ধান চাষের কারণে ম্যালেরিয়া ব্যাপক আকার ধারণ করে, যা জনসংখ্যা হ্রাস করে। এরপর ৬ষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ‘জাস্টিনিয়ানের প্লেগ’ রোম ও পারস্য উভয়কেই মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়। ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষের দিকে, সম্রাট মাউরিচিয়াসের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে পারস্য সম্রাট দ্বিতীয় খসরু রোমের বিরুদ্ধে ২৬ বছরের এক বিধ্বংসী যুদ্ধ (৬০২-৬২৮ খ্রিস্টাব্দ) শুরু করেন। এই যুদ্ধ যখন শেষ হয়, তখন উভয় সাম্রাজ্যই চূড়ান্তভাবে দুর্বল ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
ইসলামের উত্থান এবং খালিদে (রা.) ধর্মান্তর
৬১০ খ্রিস্টাব্দে আরবে নবী মুহাম্মাদ (সা.) একত্ববাদ এর দিকে আহবান শুরু করেন। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের (৬২২ খ্রিস্টাব্দ) পর মুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) প্রাথমিকভাবে মক্কার পক্ষে উহুদ (৬২৫ খ্রিস্টাব্দ) ও খন্দকের যুদ্ধে (৬২৭ খ্রিস্টাব্দ) মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। কিন্তু ৬২৭ খ্রিস্টাব্দে খন্দকের যুদ্ধে মক্কাবাসীদের পরাজয়ের পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন, যা ছিল তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
প্রথম যুদ্ধক্ষেত্র কমান্ড: মুতার যুদ্ধ (৬২৯ খ্রিস্টাব্দ)
নব মুসলিম হিসেবে খালিদ (রা.) ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে মুতার যুদ্ধে (বর্তমান জর্ডান) প্রথম সামরিক নেতৃত্ব দেন। মাত্র ৩,০০০ মুসলিম আরব সৈন্যের বিরুদ্ধে রোমান বাহিনীর (১০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ পর্যন্ত অনুমান করা হয়) বিশাল সংখ্যাধিক্য ছিল। মুসলিম সেনাপতিরা একে একে শাহাদাত বরণ করলে, খালিদ (রা.)কে কমান্ড দেওয়া হয়। তিনি এক অভূতপূর্ব কৌশল অবলম্বন করেন: রাতের আঁধারে সৈন্যদেরকে পাহাড়ের আড়ালে ঘুরিয়ে বারবার ভিন্ন ব্যানার নিয়ে দিনের বেলায় যুদ্ধের ময়দানে ফিরিয়ে আনেন, যা দেখে রোমানরা মনে করে মুসলিমদের কাছে ক্রমাগত নতুন সৈন্যদল আসছে। রাতের বেলা তিনি প্রতিটি সৈন্যকে একাধিক ক্যাম্পফায়ার জ্বালানোর নির্দেশ দেন, যা রোমানদের মধ্যে মুসলিম বাহিনীর আকার সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি করে। এই কৌশলগত পিছু হটার মাধ্যমে খালিদ (রা.) তাঁর বাহিনীকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন, যদিও এটি তাঁর একমাত্র যুদ্ধ যেখানে তিনি জয়লাভ করেননি, তবে এটি তাঁর সামরিক বুদ্ধিমত্তার প্রথম প্রমাণ ছিল।
আরব উপদ্বীপের একীকরণ: রিদ্দা যুদ্ধ (৬৩২-৬৩৩ খ্রিস্টাব্দ)
নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর ওফাতের পর (৬৩২ খ্রিস্টাব্দ), প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) এর সময় আরবের কিছু গোত্র ইসলাম ত্যাগ করে বিদ্রোহ শুরু করে। এই বিদ্রোহ দমনের জন্য খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) কে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। মাত্র এক বছরের মধ্যে, খালিদ (রা.) রিদ্দা যুদ্ধে একের পর এক সিদ্ধান্তমূলক বিজয় অর্জন করে ৬৩৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পুরো আরব উপদ্বীপকে প্রথমবারের মতো এক রাজনৈতিক সত্তার অধীনে একত্রিত করেন। এই অর্জন আরব ইতিহাসের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
ইরাক বিজয়: পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য অভিযান
আরব উপদ্বীপ একীভূত হওয়ার পর, খালিদ (রা.) পারস্য সাম্রাজ্যের দিকে অগ্রসর হন। এই অভিযানগুলো তাঁর সামরিক প্রতিভার চূড়ান্ত নিদর্শন।
- চেইনের যুদ্ধ (৬৩৩ খ্রিস্টাব্দ): বর্তমান কুয়েতে সংঘটিত এই যুদ্ধে পারস্য সেনাপতি হোরমুজদ তাঁর সৈন্যদের শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিলেন, যাতে তারা পিছু হটতে না পারে এবং খালিদ (রা.) এর অশ্বারোহী বাহিনীকে আটকাতে পারে। কিন্তু খালিদ (রা.) প্রথমে হোরমুজদকে দ্বৈত যুদ্ধে হত্যা করেন এবং পরে তার অশ্বারোহী বাহিনীর দ্রুতগতির চার্জ ব্যবহার করে শৃঙ্খলাবদ্ধ পারস্য সৈন্যদের ছত্রভঙ্গ করে দেন, যারা পিছু হটতে না পারায় সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়। ১৮,০০০ মুসলিমের বিরুদ্ধে ২০,০০০ পারস্য সৈন্যের এই যুদ্ধে মাত্র কয়েকশো মুসলিম শহীদ হন, যেখানে পারস্যদের অধিকাংশই নিহত বা বন্দী হয়।
- ওয়ালাজা ও উল্লাইস যুদ্ধ: এই যুদ্ধগুলোতে খালিদ (রা.) অসামান্য কৌশল প্রদর্শন করেন, যেখানে তিনি শত্রুদের পেছনে অশ্বারোহী বাহিনী লুকিয়ে রেখে অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে পারস্য সৈন্যদের পুরোপুরি ঘিরে ফেলতেন।
- ফিরাযের যুদ্ধ (৬৩৩ খ্রিস্টাব্দ): ইরাক বিজয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে খালিদ (রা.) ফিরায নামক স্থানে রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের সম্মিলিত বাহিনীর মুখোমুখি হন। ১৫,০০০ মুসলিম আরব সৈন্যের বিরুদ্ধে ১,৫০,০০০ রোমান ও পারস্য সৈন্যের এই বিশাল বাহিনী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল। খালিদ (রা.) ইউফ্রেটিস নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থানকারী রোমান-পারস্য বাহিনীকে নদী পার হয়ে তাঁর দিকে আসার সুযোগ দেন। প্রায় ৫০,০০০ শত্রু সৈন্য নদী পার হওয়ার পর তিনি তাঁর সৈন্যদের দ্রুত আক্রমণ করার নির্দেশ দেন। খালিদ (রা.) তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীকে শত্রুদের মধ্যে এমনভাবে প্রবেশ করিয়ে বারবার পিছু হটিয়ে সংকুচিত করে দেন যে, তারা নিজেদের অস্ত্র চালানোর মতো জায়গাও পাচ্ছিল না। ভীতসন্ত্রস্ত শত্রু সৈন্যরা পিছু হটার চেষ্টা করলে তারা পদদলিত হয়ে মারা যায়। এই অবিশ্বাস্য যুদ্ধে মাত্র ২০০ মুসলিম শহীদ হন, যেখানে প্রায় ৫০,০০০ রোমান ও পারস্য সৈন্য নিহত হয়।
ফিরাযের যুদ্ধের পর খালিদ মক্কায় হজ পালন করতে যান, যা খলিফা আবু বকর (রা.) জানতে পারেন। আবু বকর (রা.) খালিদ (রা.) কে সতর্ক করেন, কিন্তু তাঁর অতুলনীয় সামরিক সাফল্যের কারণে তাকে ক্ষমা করেন।
সিরিয়া বিজয়: রোমান সাম্রাজ্যের পতন
আবু বকর (রা.) খালিদকে সিরিয়া আক্রমণের নির্দেশ দেন। খালিদ (রা.) তাঁর সৈন্যদের নিয়ে সেই ভয়ংকর মরুভূমি পাড়ি দেন যেখানে কোনো পানি বা খাদ্যের সংস্থান ছিল না। এটি ছিল এক অসাধারণ লজিস্টিক্যাল অর্জন। সিরিয়ায় প্রবেশ করে তিনি দ্রুত দামেস্ক জয় করেন।
এই সময়ে, খলিফা আবু বকর (রা.) ইন্তেকাল করেন এবং উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) নতুন খলিফা হন। খলিফা উমর (রা.), যিনি খালিদ (রা.) এর চাচাতো ভাই ছিলেন, খালিদ (রা.) ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তাই তিনি খালিদ (রা.) কে সেনাপতির পদ থেকে সরিয়ে আবু উবাইদাহ (রা.) কে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তবে আবু উবাইদাহ (রা.), খালিদের সামরিক প্রতিভায় আস্থাশীল ছিলেন এবং সৈন্যদের ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে খালিদকে অনানুষ্ঠানিকভাবে সামরিক কমান্ডের দায়িত্ব দেন।
- ইয়ারমুকের যুদ্ধ (৬৩৬ খ্রিস্টাব্দ): সিরিয়া বিজয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ছিল ইয়ারমুকের যুদ্ধ। প্রায় ৪০,০০০ মুসলিম আরব সৈন্যের বিরুদ্ধে রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের ১,২০,০০০ সৈন্যের বিশাল বাহিনী প্রস্তুত ছিল। খালিদ (রা.) তাঁর বাহিনীকে ইয়ারমুক উপত্যকার প্রান্তে এমনভাবে স্থাপন করেন যে তাদের বাম দিকটি একটি গভীর উপত্যকা দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। প্রথম কয়েকদিন রোমানরা মুসলিমদের উপর তীব্র আক্রমণ চালায়, কিন্তু খালিদ (রা.) তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে বারবার রোমান আক্রমণ প্রতিহত করেন। যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে, মুসলিমদের ডান পাশ প্রায় ভেঙে পড়লে, মুসলিম নারীরা তাঁবুর খুঁটি নিয়ে পিছু হটা সৈন্যদের দিকে ধেয়ে এসে চিৎকার করে বলেন: “তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের অসম্মান করেছ, এখন তোমাদের সামনে দুটি পথ – হয় স্ত্রীদের হাতে নিহত হও, না হয় রোমানদের হাতে!” এই ঘটনা সৈন্যদের মনোবল ফিরিয়ে আনে এবং তারা রোমানদের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ করে।
ষষ্ঠ দিনে খালিদ (রা.) তাঁর সকল অশ্বারোহী (প্রায় ৮,০০০) নিয়ে রোমানদের বাম পাশে তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি রোমানদের পশ্চাদপসরণের একমাত্র পথ, পশ্চিম উপত্যকার উপরের সেতুটি ৫০০ অশ্বারোহী পাঠিয়ে দখল করে নেন। রোমান সৈন্যরা যখন পিছু হটতে শুরু করে, তখন তারা মুসলিমদের দ্বারা অবরুদ্ধ সেতুর দিকে ছুটে যায় এবং সেখানে আটকা পড়ে ধ্বংস হয়। ভাহান, রোমান সেনাপতি, তার অশ্বারোহী বিচ্ছিন্নতা নিয়ে পালাতে সক্ষম হলেও, খালিদ (রা.) তার দ্রুততম অশ্বারোহীদের নিয়ে তাকে ধাওয়া করেন এবং দামেস্কের বাইরে তাকে দ্বৈত যুদ্ধে পরাজিত ও হত্যা করেন। এই বিজয়ের পর রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস সিরিয়াকে “আরবদের জন্য একটি সুন্দর প্রদেশ” বলে বিদায় জানান।
জেরুজালেম বিজয় — ইতিহাসের হৃদয়ে খোদাই এক মর্মস্পর্শী দৃষ্টান্ত
ইয়ারমুকের বিজয়ের পর, মুসলিম সেনাবাহিনী জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হয়। জেরুজালেমের আর্চবিশপ সোফ্রোনিয়াস মুসলিমদের সাথে আলোচনার প্রস্তাব দেন, তবে শর্ত দেন যে তিনি কেবল খলিফা উমরের (রা.) সাথেই আত্মসমর্পণ নিয়ে আলোচনা করবেন। খালিদ (রা.) কে খলিফা হিসেবে পরিচয় করানোর চেষ্টা ব্যর্থ হলে, অবশেষে খলিফা উমর (রা.) মক্কা থেকে জেরুজালেমে আসেন।
উমরের (রা.) আগমন ছিল এক বিস্ময়কর দৃশ্য। তিনি জীর্ণ পোশাক পরেছিলেন এবং তাঁর উটের উপর আরোহী একজন সাধারণ দাস ছিল, আর উমর পালাক্রমে উটের লাগাম ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন। সোফ্রোনিয়াস, যিনি নিজে মূল্যবান বস্ত্র ও গহনা পরিহিত ছিলেন, খলিফার এই বিনয়ী রূপ দেখে হতবাক হয়ে যান। উমর জেরুজালেম আত্মসমর্পণের জন্য যে শর্ত দেন, তা ছিল অভূতপূর্ব: কোনো লুটপাট, দাসত্ব বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে না। শুধুমাত্র রোমান রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের তাদের বহনযোগ্য জিনিসপত্র নিয়ে শহর ছেড়ে চলে যেতে অনুমতি দেওয়া হয়।
শহরের মধ্যে প্রবেশ করে, উমর (রা.) সোফ্রোনিয়াসের গির্জায় নামাজ পড়তে অস্বীকৃতি জানান, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে তাঁর নামাজ পড়লে সেই গির্জাটি ভবিষ্যতে মসজিদে রূপান্তরিত হতে পারে। এর পরিবর্তে তিনি একটি খালি জমিতে নামাজ পড়েন, যা বর্তমানে একটি মসজিদ হিসেবে পরিচিত। এরপর তিনি ‘টেম্পল মাউন্ট’ পরিদর্শন করেন, যা রোমানরা ৫০০ বছর ধরে আবর্জনা ফেলার স্থানে পরিণত করেছিল। উমর (রা.) ব্যক্তিগতভাবে আবর্জনা পরিষ্কার করা শুরু করেন, এবং তাঁর সেনাবাহিনীও তাঁর সাথে যোগ দিয়ে পুরো এলাকা পরিষ্কার করে।
উমর (রা.) ইহুদিদের জেরুজালেম থেকে বিতাড়িত ও গণহত্যার কথা জানতে পেরে বিচলিত হন। তিনি একজন ইহুদি ধর্মান্তরিত মুসলিমকে ৮০টি ইহুদি পরিবার খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন যারা জেরুজালেমে এসে পুনরায় বসবাস করতে আগ্রহী ছিল। এভাবেই মুসলিমরা জেরুজালেম জয় করে এবং শহরটিকে সকল ধর্মের মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়।
ইতিহাসের সূর্যসন্তান খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ — মৃত্যুপ্রহরে এক অবিনশ্বর তৃষ্ণা
জেরুজালেম বিজয়ের পর, খলিফা উমর (রা.) খালিদ (রা.) কে মক্কায় অবসর নিতে বাধ্য করেন, কারণ তাঁর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে উমরে (রা.) এর উদ্বেগ ছিল। খালিদ (রা.) আর কোনো যুদ্ধে অংশ নেননি। ৫০ বছর বয়সে তিনি বিছানায় স্বাভাবিকভাবে মারা যান, যা তাঁর জন্য গভীর দুঃখের কারণ ছিল। তাঁর শেষ কথাগুলো ছিল, “আমার দেহের এমন কোনো স্থান নেই যেখানে খড়গ এর আঘাত নেই, আমি অসংখ্য ক্ষতচিহ্নে আবৃত। জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসে আমার একটিই আকাঙ্ক্ষা ছিল, আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে করতে বীরের মতো শাহাদাতের মহিমা অর্জন করা।
অনুবাদ: জুবায়ের আল মাহমুদ ( সম্পাদক – আল মুস্তাকিম )
মূল: ড. রয় ক্যাসোগ্রান্ডা এর বিশ্ববিদ্যালয় শ্রেণীকক্ষের লেকচার ( তিনি একজন অমুসলিম গবেষক এবং রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং ইতিহাসের বিভিন্ন বিষয়ে বক্তৃতা দেন )
Estimated reading time: 8 minutes