সম্পত্তিতে নারীর বঞ্চনা: কুসংস্কার, দুর্নীতি, আইন লঙ্ঘন

**শিরোনাম: সম্পত্তিতে নারীর অধিকার হরণ: শরিয়াহ নির্দেশিত আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন, নেপথ্যে সামাজিক কুসংস্কার ও নীরব দুর্নীতি**

**ঢাকা, ২৬ অক্টোবর, ২০২৩:** বাংলাদেশের গ্রামীণ ও আধা-শহুরে এলাকায় নারীরা তাদের পৈতৃক ও মাতৃতান্ত্রিক সম্পত্তির আইনি অধিকার থেকে পদ্ধতিগতভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা শরিয়াহ এবং দেশের প্রচলিত আইন উভয়েরই সরাসরি লঙ্ঘন। আমাদের অনুসন্ধানী ইউনিটের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে দেখা গেছে, মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) প্রয়োগ আইন, ১৯৩৭ এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর অধীনে স্পষ্ট অধিকার থাকা সত্ত্বেও, অধিকাংশ নারী সামাজিক চাপ, ভুল ব্যাখ্যা এবং কুসংস্কারের শিকার হয়ে তাদের প্রাপ্য জমি স্বেচ্ছায় বা জোরপূর্বক ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

**আইনের চোখে নারীর অধিকার: শরিয়াহ ও রাষ্ট্রীয় বিধান**

বাংলাদেশে মুসলমানদের উত্তরাধিকার মূলত শরিয়াহ ভিত্তিক ‘ফারায়েজ’ আইন দ্বারা পরিচালিত হয়, যা রাষ্ট্রীয় আইনেও স্বীকৃত। এই আইন অনুযায়ী, নারীদের সম্পত্তির উপর সুনির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে:

* **কন্যা:** পুত্র যা পায়, কন্যার অংশ তার অর্ধেক। যদি শুধু কন্যা সন্তান থাকে এবং কোনো পুত্র না থাকে, তবে তারা সম্মিলিতভাবে সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ (একাধিক কন্যা) বা অর্ধেক (একক কন্যা) পায়।
* **স্ত্রী:** সন্তান থাকলে ১/৮ অংশ এবং সন্তান না থাকলে ১/৪ অংশ পান।
* **মাতা:** মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে ১/৬ অংশ পান।

সম্পত্তির মালিকের মৃত্যুর সাথে সাথেই এই অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে নারীদের উপর “vested” বা অর্পিত হয়। মালিকানা শুরুর জন্য নতুন করে কোনো ‘হস্তান্তর’ বা দলিলপত্রের প্রয়োজন হয় না, যদিও ব্যবস্থাপনার জন্য নামজারি অপরিহার্য।

**সামাজিক কুসংস্কারের আড়ালে অধিকার হরণ**

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তিনটি প্রধান “কুসংস্কার” এবং সামাজিক প্রথা আইনি অধিকারকে পাশ কাটাতে ব্যবহৃত হয়:

* **‘নাইয়র’ প্রথা বনাম ভূমি অধিকার:** গ্রামীণ বাংলাদেশে বিবাহিত নারীর পিত্রালয়ে সচরাচর ‘নাইয়র’ যাতায়াতকে উত্তরাধিকারের বিকল্প হিসেবে দেখা হয়। ভাইয়েরা নাইয়রের সময় বোনকে উপহার বা আপ্যায়ন করে, যা মূলত বোনকে তার ভূমির দাবি থেকে বিরত রাখার একটি অনানুষ্ঠানিক “প্রতিদান”।
* **‘অশুভ’ কুসংস্কার:** প্রচলিত একটি ভ্রান্ত ধারণা হলো, বোন তার পৈতৃক সম্পত্তির অংশ নিলে ভাইয়ের সংসারে “বরকত” (ঐশ্বরিক আশীর্বাদ) থাকবে না, কিংবা বোনের নিজের সন্তানদের জন্য দুর্ভাগ্য বয়ে আনবে।
* **‘ত্যাগের’ মহিমা:** সমাজে যে নারীরা স্বেচ্ছায় ভাইদের কাছে তাদের অংশ “হেবা” (দান) করেন, তাদের “মহৎ” ও “গুণবতী” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এর বিপরীতে, যারা নিজেদের আইনি অধিকার দাবি করেন, তাদের লোভী বা “পরিবার ভাঙার কারণ” হিসেবে কলঙ্কিত করা হয়।

**চমকপ্রদ পরিসংখ্যান: বিভাজনের দীর্ঘসূত্রতা ও নারীর বঞ্চনা**

বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও ভূমি সংস্কার ও উন্নয়ন সংস্থার (ALRD) সমীক্ষা অনুযায়ী, নারীরা আইনগতভাবে মোট উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জমির ২৫-৩৩% এর অধিকারী হলেও, বাস্তবে তাদের নিবন্ধিত মালিকানা ১০-১৫% এর নিচে থাকে।

* **বন্টন মামলার দীর্ঘসূত্রতা:** সম্পত্তি দাবি করার আইনি প্রক্রিয়া “বন্টন মামলা” বাংলাদেশের দেওয়ানি আদালতে নিষ্পত্তিতে গড়ে ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগে।
* **সহিংসতার যোগসূত্র:** বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পারিবারিক সহিংসতা এবং ভাইদের দ্বারা বোনদের “সামাজিক বয়কটের” অন্যতম প্রধান কারণ হলো ভূমি বিরোধ।

**নানা কৌশলে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার প্রক্রিয়া**

নারীদের তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করতে একাধিক পদ্ধতিগত কৌশল অবলম্বন করা হয়:

* **জোরপূর্বক ‘হেবা’ (দান):** বাবার মৃত্যুর পরপরই ভাইয়েরা বোনদের ওপর “হেবা-নামা” (দানপত্র) সই করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে, প্রায়শই “একসাথে জমি দেখাশোনা করার” মিথ্যা অজুহাতে।
* **নামজারি (মিউটেশন) জালিয়াতি:** পুরুষ উত্তরাধিকারীরা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় থেকে ‘ওয়ারিশ সনদ’ (উত্তরাধিকার সনদ) সংগ্রহ করার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে নারী উত্তরাধিকারীদের নাম বাদ দিয়ে দেন।
* **আবেগিক ব্ল্যাকমেইল:** “তুমি জমি নিলে এই বাড়িতে আর কখনও আসতে পারবে না” – এমন হুমকি দেওয়া হয়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বিবাহবিচ্ছেদ বা বিধবা হওয়ার পর নারীদের জন্য পিত্রালয় হারানো এক অস্তিত্বের সংকট তৈরি করে।

**স্টেকহোল্ডারদের মতামত: কে কী বলছেন?**

* **ধর্মীয় পণ্ডিতগণ (ওলামা):** অধিকাংশ প্রথাগত আলেম বলেন, নারীদের ফারায়েজ থেকে বঞ্চিত করা “কাবীরা গুনাহ” (মারাত্মক পাপ)। তবে, জুমার খুতবা বা ওয়াজে এই আইনের ব্যবহারিক প্রয়োগের ওপর তাদের জোর কম থাকে, বরং তারা বেশি মনোযোগ দেন ধর্মীয় আচারের উপর।
* **মানবাধিকার কর্মীরা:** শরিয়াহ-ভিত্তিক এই ব্যবস্থার (১:২ অনুপাত) অসমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১’ এর পক্ষে, যা ভূমি অধিকার সংক্রান্ত ধারাগুলো নিয়ে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ব্যাপক প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল।
* **বিচার বিভাগ/আইন বিশেষজ্ঞরা:** তারা উল্লেখ করেন যে আইন স্পষ্ট, তবে ভূমি প্রশাসন দুর্নীতিগ্রস্ত। তহসিলদাররা প্রায়শই পুরুষ উত্তরাধিকারীদের কাছ থেকে ঘুষের বিনিময়ে নারীদের বাদ দিতে সাহায্য করেন।

**উত্তরাধিকার অধিকার: পরিবর্তনের হাওয়া ও ডিজিটাল সমাধান**

বাংলাদেশ সরকারের “ডিজিটাল ভূমি সেবা” উদ্যোগ নারী উত্তরাধিকারীদের বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলছে, কারণ এই ব্যবস্থায় জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) সংযুক্ত ওয়ারিশ সনদের প্রয়োজন হয়। এছাড়াও, বর্তমান শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম ক্রমবর্ধমান হারে “বন্টন মামলা” দায়ের করছে, যা দেওয়ানি আদালতে মামলার জট বাড়ালেও সামাজিক বিতর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।

**নীরবতার মূল্য: সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি**

এই প্রতিবেদন স্পষ্ট করে তোলে যে, উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার বঞ্চিতকরণ শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় বা আইনগত ইস্যু নয়, বরং এটি দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। যেখানে সামাজিক কুসংস্কারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় ও ইসলামিক উভয় আইনকেই অবমাননা করা হচ্ছে। পরিবারে ‘শান্তি’ বজায় রাখার জন্য নারীরা যখন তাদের অধিকার ‘উপহার’ দেন, তখন তারা যে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হন, সেই “নীরবতার মূল্য”ই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

উন্নয়নের কাজ চলছে

"আল মুস্তাকিম" এর সংবাদ প্রকাশনা বিভাগ সাময়িক ভাবে স্থগিত রয়েছে।

This will close in 20 seconds