পশ্চিমা ইসলামোফোবিয়া: আখলাকই ভুল ধারণা ভাঙার হাতিয়ার

**পশ্চিমা গণমাধ্যমে পরিকল্পিত ইসলামোফোবিয়া: সুন্দর আখলাকের মাধ্যমে ভুল ধারণা ভাঙার আহ্বান**

পশ্চিমা গণমাধ্যমে ইসলামোফোবিয়া নিছকই আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি সুপরিকল্পিত অপপ্রচার ও আর্থিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্ত একটি শক্তিশালী বয়ান। তবে, এই নেতিবাচক চিত্রের বিরুদ্ধে ইসলামের মৌলিক দর্শন ‘আখলাক’ বা উন্নত চরিত্রই সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠছে, যা বিশ্বজুড়ে ভুল ধারণা ভাঙতে সক্ষম হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক অভ্যন্তরীণ গবেষণা প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।

**ইসলামোফোবিয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট**

স্নায়ুযুদ্ধোত্তর সময়ে স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব ইসলামকে পশ্চিমা বিশ্বের নতুন মতাদর্শিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছিল। এরপর ৯/১১-এর ঘটনা “সন্ত্রাসবাদ” শব্দটিকে মূলধারার গণমাধ্যমে “ইসলামিক” পরিচয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জুড়ে দেয়, যা ইসলামবিদ্বেষী আখ্যানকে আরও শক্তিশালী করে।

এই পটভূমিতে, ২০০১ সালে আফগানিস্তান আক্রমণ, ২০১১ সালের আরব বসন্তকে “ইসলামিক বিশৃঙ্খলা” হিসেবে উপস্থাপন এবং ২০১৫-১৭ সালের ইউরোপীয় শরণার্থী সংকট ও “শার্লি হেবদো” হামলার মতো ঘটনাগুলো পশ্চিমা সমাজে ইসলামোফোবিয়াকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এমনকি ২০১৯ সালের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে হামলার পর শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী বনাম ইসলামিক লেবেল নিয়ে গণমাধ্যমের ক্ষণিকের আত্ম-পর্যালোচনাও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

**গণমাধ্যমে পরিকল্পিত অপপ্রচার ও বয়ান নির্মাণ**

গবেষণায় দেখা গেছে, ইসলামোফোবিয়া একটি “শিল্প” হিসেবে কাজ করে, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু ফাউন্ডেশন ও থিঙ্ক ট্যাঙ্ক (যেমন: ডোনার্স ক্যাপিটাল ফান্ড) অ্যান্টি-মুসলিম বয়ান প্রচারে ৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন করেছে। একে “ফিয়ার, ইনকর্পোরেটেড” (Fear, Inc.) ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা ইসলামবিদ্বেষকে অর্থ দিয়ে লালন করে।

গণমাধ্যম প্রায়শই আক্রমণকারীদের ক্ষেত্রে দ্বৈত মানদণ্ড প্রয়োগ করে: শ্বেতাঙ্গ হামলাকারীদের ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’ বা ‘লোন উলফ’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়, অথচ মুসলিম হামলাকারীদের তাদের ধর্মের প্রতিনিধি হিসেবে দেখানো হয়। মুসলিম নারীদের প্রায়শই ‘পশ্চিমা মুক্তির মুখাপেক্ষী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা মুসলিম নারী নেতৃত্বকে উপেক্ষা করে। এছাড়া, গণমাধ্যম ‘ভালো মুসলিম বনাম খারাপ মুসলিম’ নামক একটি বিভেদ তৈরি করে, যেখানে কেবল সেসব মুসলিমকেই প্ল্যাটফর্ম দেওয়া হয় যারা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

**পরিসংখ্যান ও চলমান পরিস্থিতি**

যুক্তরাজ্যে ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, মুসলিম কাউন্সিল অফ ব্রিটেনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ইসলাম সম্পর্কিত ৫০% এর বেশি মিডিয়া নিবন্ধে নেতিবাচক পক্ষপাত রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (CAIR) ২০২৩ সালে ৮,০৬১টি মুসলিমবিরোধী অভিযোগের রেকর্ড করেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৫৬% বৃদ্ধি। গাজা সংঘাত নিয়ে গণমাধ্যমের কভারেজ এর একটি বড় কারণ।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতেও পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদম (যেমন: এক্স, ফেসবুক) ইসলামবিদ্বেষী কন্টেন্টকে প্রায়শই বেশি গুরুত্ব দেয়, যা “রেজ-বাইট” (rage-bait) হিসেবে কাজ করে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

**সুন্দর আখলাক: অপপ্রচারের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিরোধ**

এই নেতিবাচক বয়ানের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী পাল্টা কৌশল হিসেবে ‘আখলাক’ বা উন্নত চরিত্রচর্চার ভূমিকা অনস্বীকার্য। ইসলামিক ধর্মতত্ত্বে ‘আখলাক’ বলতে সততা, নৈতিকতা ও শিষ্টাচারের অনুশীলনকে বোঝায়। গবেষকরা বলছেন, ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ এর চেয়ে ‘বাস্তব জীবনে ইসলাম’ উপস্থাপন করাই পক্ষপাতিত্ব ভাঙতে বেশি কার্যকর।

এক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি দৃষ্টান্ত রয়েছে:
* **মোহাম্মদ সালাহ প্রভাব:** স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মোহামেদ সালাহ লিভারপুল এফসিতে যোগ দেওয়ার পর মার্সিসাইডে (যুক্তরাজ্য) ঘৃণা-অপরাধ ১৮.৯% কমেছে। তার প্রকাশ্য ধর্মীয় চর্চা ও বিনয় (আখলাক) লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে ইসলামকে মানবিক করেছে।
* **দুর্যোগ মোকাবিলায় অবদান:** ইসলামিক রিলিফ বা বাংলাদেশের খিদমত ফাউন্ডেশনের মতো সংস্থাগুলো দুর্যোগের সময় প্রায়শই প্রথম সাড়াদানকারী হিসেবে কাজ করে। তাদের নিঃস্বার্থ সেবামূলক কাজ স্থানীয় গণমাধ্যমকে ‘ইতিবাচক মুসলিম’ বাস্তবতা তুলে ধরতে বাধ্য করে।
* **নিউজিল্যান্ডের প্রতিক্রিয়া:** ২০১৯ সালের ক্রাইস্টচার্চ হামলার পর মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষমা ও শান্তিপূর্ণ আচরণ দেশটির জাতীয় আখ্যান পরিবর্তন করে দেয়, যা সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দমনের দিকে পরিচালিত করে।

**বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা**

মূলধারার পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো প্রায়শই যুক্তি দেয় যে তারা “ঘটনা” তুলে ধরছে এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে ইসলামের যোগসূত্র সংশ্লিষ্ট অভিনেতাদের বাস্তবতা, প্রতিবেদকের পক্ষপাত নয়। তবে, শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা ইসলামোফোবিয়াকে এক ধরণের ‘সাংস্কৃতিক বর্ণবাদ’ হিসেবে দেখেন, যা রাজনীতিবিদরা বৈদেশিক হস্তক্ষেপ বা কঠোর অভ্যন্তরীণ নীতিকে ন্যায্যতা দিতে ব্যবহার করেন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশসহ গ্লোবাল সাউথের অনেক মানুষ পশ্চিমা গণমাধ্যমকে নব্য-উপনিবেশবাদের একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখে। তাদের মধ্যে এই ধারণা ক্রমশ দৃঢ় হচ্ছে যে, “গণমাধ্যম যুদ্ধে” জয়ী হওয়ার একমাত্র উপায় প্রতিবাদ নয়, বরং শিক্ষা, আচরণ এবং পেশাগত সততার মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা।

**আমাদের জন্য মূল বার্তা: বাংলাদেশের ভূমিকা**

এই গবেষণার মূল বার্তাগুলো আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
* **অর্থনৈতিক পক্ষপাত:** ইসলামোফোবিয়া কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি নির্দিষ্ট স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী দ্বারা পরিকল্পিতভাবে অর্থায়ন করা হয়।
* **ভাষা ও পরিভাষা:** “জিহাদি” বা “ইসলামিস্ট” এর মতো শব্দগুলোর অপব্যবহার জনমনে ভীতি সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
* **ব্যক্তিগত ভূমিকা:** গণমাধ্যমের প্রভাব ব্যাপক হলেও, ‘আখলাক’ বা উন্নত চরিত্র একটি ‘আখ্যান-বিঘ্নকারী’ হিসেবে কাজ করে, যা গণমাধ্যম সহজে উপেক্ষা করতে পারে না।
* **বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ:** আমাদের স্থানীয় প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশি প্রবাসীরা কীভাবে পশ্চিমা বিশ্বে ‘আখলাকের রাষ্ট্রদূত’ হিসেবে কাজ করে ভুল ধারণা ভাঙতে পারে, তার ওপর জোর দেওয়া উচিত। সুন্দর আচরণ এবং নৈতিকতার মাধ্যমে ইসলামের সঠিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মূল কৌশল।

উন্নয়নের কাজ চলছে

"আল মুস্তাকিম" এর সংবাদ প্রকাশনা বিভাগ সাময়িক ভাবে স্থগিত রয়েছে।

This will close in 20 seconds